0
“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”
“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”
রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে আসেন, তখন আর লালন ফকির বেঁচে নেই। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালনের সাক্ষাত্ না পেলেও তার গানের সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোনো ভক্তের হাতের লেখা লালনের একটি গানের খাতা উদ্ধার করেছিলেন। সেখানে অনেকগুলো গান ছিল। এরপরও তিনি বহু ভক্ত-শিষ্যের কাছ থেকে লালনের আরও বহু গান সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর সেগুলো প্রকাশ করেছিলেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। এভাবেই লালনের গানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে সভ্যসমাজের মানুষের। কুষ্টিয়া জেলার সীমাবদ্ধ গণ্ডি ছাড়িয়ে লালনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বঙ্গদেশে।
লালনের গান রবীন্দ্রনাথকে দারুণভাবে আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পর্বে (গীতাঞ্জলি, গীতালী, গীতিমাল্য ও খেয়াকাব্য) তার যে আধ্যাত্মিকতার ছাপ, সেক্ষেত্রে বৈষ্ণব সাহিত্য এবং উপনিষদের পাশাপাশি লালনের গানও তাকে সমানভাবে প্রভাবিত করেছিল। লালন ছিলেন নিরক্ষর মানুষ অথচ তার গানের ভাব-ভাষা কী চমত্কার! আজও তার আবেদন এতটুকু কমেনি। শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে তাকে প্রথম সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অবশ্য লালনের সাক্ষাত্ হয়নি।তবে রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের দেখা হয়েছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। তার কাছেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম লালন ফকিরের নাম শোনেন।
কবি তার অক্সফোর্ডে দেয়া বক্তৃতায় লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের ইংরেজি তরজমা করে তার বিদেশী শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন। কবির সেই বক্তৃতা পরে ‘মানুষের ধর্ম’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। সেই বক্তৃতায় কবি লালনকে উপনিষদের ঋষিদের সাথে তুলনা করেছিলেন। রবীন্দ্রের এই ভূমিকার ফলেই লালন সম্বন্ধে শিক্ষিত শ্রেণির কৌতুহল বেড়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই এর ফলে লালন এক নিরক্ষর পল্লী এলাকার ফকির থেকে রাতারাতি উন্নতমানের সাধক, গায়ক ও কবি হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। শুধু তাই নয় – রবীন্দ্রনাথ লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটি আর বিখ্যাত গোরা উপন্যাসেও উদ্ধৃত করেছেন।

Post a Comment

 
Top