0
মধ্যযুগের রোমান্টিক কবি দৌলত কাজী
মধ্যযুগের রোমান্টিক কবি দৌলত কাজী
 মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যখন দেবদেবীর মাহাত্মকীর্তনে মুখরিত হয়েছিল তখন আরাকানের রাজ সভায় বাংলা সাহিত্য চর্চার নিদর্শন হিসাবে কবি দৌলত কাজী ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী' কাব্য রচনা করে মধ্যযুগের রোমান্স কাব্য ধারার যে চরম বিকাশ ঘটিয়েছিলেন তা পরবর্তীকালের রোমান্টিক কাব্যের পথিকৃৎ হিসাবেও তিনি গণ্য হচ্ছেন। চর্যাপদ থেকে শুরু করে পদাবলী মংগল কাব্য অবধি মধ্যযুগের (১২০০-১৮০০) বাংলা সাহিত্যে দেবদেবীর মহাত্ম্য, ধর্মীয় শাস্ত্রকথাই বেশি গুরুত্ব পেত। মানুষের কাহিনী অবলম্বনে কাব্যরচনার কোন প্রয়াসই তখন পরিলক্ষিত হয়নি। মধ্যযুগের ধর্ম সংস্কারমুক্ত ঐহিক কাব্য রচনার প্রথম প্রবর্তন করেন মুসলমান কবিরাই। আর এই ধারার সর্বোত্তম বিকাশ ঘটে রোসাংগ বা আরাকানে অবস্থানরত কবিদের মাধ্যমে। আর এই ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন দৌলত কাজী। দৌলত কাজী চট্টগ্রামের রাউজান থানার অন্তর্গত সুলতানপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যযুগের কবিদের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী তারকাব্যে কবির পৃষ্ঠপোষক সম্পর্কে বিবরণ থাকলেও নিজের পরিচয় সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
কিছু ভাষা বিদ ও সাহিত্যিকদের মতে  কবির জীবনকাল আনুমানিক ১৬০০ থেকে ১৬৩৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। কবি সম্পর্কে নানান ধরনের কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। সে সব কিংবদন্তী থেকে জানা যায় যে, কবি অল্প বয়সে নানা বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। বয়সের স্বল্পতাহেতু নিজদেশে স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ হয়ে কবি আরাকানে আশ্রয় নেন এবং সেখানে যথার্থ মর্যাদা লাভে সমর্থ হন। আরাকানের তৎকালীন রাজা থিরিথু ধম্মা বা শ্রী সুধর্মার লস্কর পুজির বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আশরাফ খানের অনুরোধে দৌলত কাজী আলোচিত কাব্যটি রচনা করেন। সম্ভবত ১৬২২ থেকে ১৬৩৮ খৃস্টাব্দের মধ্যে কাব্যটি রচিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কাব্যটি শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর প্রায় ২০ বছর পরে ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে কবি আলাওল কাব্যের শেষাংশ রচনা করে তা সম্পূর্ণ করেন। তিন খন্ডে সমাপ্ত এ কাব্যের প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে দৌলত কাজী তার উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ে কবি প্রতিভার যে অনন্য নিদর্শন রেখে গেছেন তার মূল্য আলাওলের রচনা পাশে খুব সহজেই স্বীকৃতি। একটি অসমাপ্ত কাব্যের মধ্যে কবি দৌলত কাজী যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তাতে বাংলা সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করা সম্ভব হয়েছিল। দৌলত কাজী প্রাচীন বাংলার শক্তিমান কবিদের মধ্যে তিনি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। তার কাব্যের আখ্যানভাগ উত্তর ভারতীয় উৎস থেকে আহরিত বলে তিনি হয়ত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ মৌলিকত্ব দাবি করতে পারেন না। কিন্তু তিনি যে প্রচলিত লোককাহিনীকে একটি রমণীয় রূপকথাধর্মী আখ্যায়িকায় পরিণত করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাব্যের সর্বত্র তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। অমর তুলিকার যাদুস্পর্শে ময়নামতীর সতীত্ব, লোবের যৌবন চাঞ্চল্য ও কামনা, চন্দ্রানীর নটিপনা ও অসংযম, ছাতনের লাম্পট্য, রওনা মালিনীর ধূর্ততা ও চাতুর্য যেভাবে সার্থকতা সহকারে রূপায়িত হয়ে উঠেছে তাতে তার কাব্যে মৌলিকতার সাক্ষ্য বিদ্যমান। তার শিল্প ও সৌন্দর্যবোধ ছিল তীক্ষ্ম ও হৃদয়গ্রাহী। বাংলার সংগে সংগে ব্রজবুলি ভাষায়ও তার বিশেষ ক্ষমতা ছিল। তিনিই বাংলা ভাষার একমাত্র কবি যিনি হাতে প্রমাণ করেছেন যে রাধাকৃষ্ণ প্রেমকাহিনী উপজীব্য না করেও ব্রজবুলি ভাষায় সার্থক কাব্য রচনা করা সম্ভব। কবির ভাষা ও কবিত্বের নিদর্শন ঃ
‘‘কি কহিব কুমারীর রূপের প্রসংগ।
অংগের লীলায় যেন বান্ধিছে অনংগ\
কাঞ্চন কমল মুখ পূর্ণ শশী নিন্দে।
অপমানে জ্বলেতে প্রবেশে অরবিন্দে\’’
রচনারীতির দিক থেকে কবি বাণী ভংগিমায় ক্লাসিক ও রোমান্টিক রীতির অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সমগ্র মধ্যযুগীয় সাহিত্যে এক বিরল নজির স্থাপন করেছেন। উপরোক্ত উদ্ধৃতিটিই তার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। তার বারমাসী রচনায় নায়িকার মানসিক চাঞ্চল্যের পরিবর্তে যে দৃঢ়চিত্ততার সুস্পষ্ট পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে তাতে তিনি মধ্যযুগীয় গতানুগতিকতার ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত। রোমাঞ্চ কাব্যধারা মধ্যযুগীয় গতানুগতিক ধর্মীয় সাহিত্যে ধারার মাঝে যে নতুন ধারার ভিত্তি রচনা করেছিল তার উপর তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক চেতনাকে সর্ব প্রথম নিয়ে এসেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি শুধু বাংলা সাহিত্যে নন বিশ্ব সাহিত্যেও এক বিরল দৃষ্টান্ত। কেন না যে পাশ্চাত্য সাহিত্যে আজ রোমান্টিসিজমের স্রষ্টা বলে। বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত সেই পাশ্চাত্যেও এই রোমান্টিসিজম এসেছিল অষ্টাদেশ শতাব্দীরও শেষ পর্যায়ে এসে। এক্ষেত্রে দৌলত কাজী তা প্রায় দুই শতাব্দী আগেই সেই কাব্যচেতনাকে তার কাব্যে রূপ দিয়েছেন। সুতরাং গ্যেটে, ওয়ার্ড ওয়ার্থ কিংবা কীটস নন দৌলত কাজীই বিশ্বের প্রথম রোমান্টিক কবি।

Post a Comment

 
Top