0
চাতুর্মাস্য ব্রতকথা
চাতুর্মাস্য ব্রতকথা
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বাদশীতে শয়ন ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এসময় থেকে চারমাস কাল ভগবান শয়ন যাপন করেন। চাতুর্মাস্য ব্রতের উদযাপন কাল সম্বন্ধে বরাহ পুরাণে সুন্দরভাবে বলা হয়েছে -
.
"আষাঢ় মাসে শুক্লা দ্বাদশী তিথি হতে কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশী পর্যন্ত চারটি চন্দ্র মাসে এই ব্রত নিয়ম পালন করতে হয়। অর্থাৎ আষাঢ় পূর্ণিমা থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত চারটি চন্দ্রমাস কাল এই ব্রতের সময়। অথবা কর্কট সংক্রান্তি অর্থাৎ সৌর শ্রাবণ হতে সৌর কার্তিক পর্যন্ত শ্রীচাতুর্মাস্য ব্রতের কাল। যাঁরা উপর্যুক্ত চাতুর্মাস্য বিধানের তিন প্রকার পথ অনুসরণে চাতুর্মাস্য ব্রত পালনে অসমর্থ, তাঁরা নিয়ম সেবা পালন করে কার্তিক মাসে হরিনাম কীর্তন জপাদি দ্বারা বিধিপূর্বক ব্রত পালন করবেন।"
.
চাতুর্মাস্য বিধানে বলা হয়েছে- "হে মহাবিষ্ণু! আপনার জয় হোক। বিশ্বের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করুন।" - এই প্রার্থনা করে জলের মধ্যে ভগবানকে যথাবিধি গন্ধপুষ্পাদি দ্বারা সুখে স্নান ও মহাপূজা করা কর্তব্য।
.
হরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে-
"হে দেব! শ্বেতদ্বীপের মধ্যে ফণা মণি সুশোভিত শেষরূপ এই বিশ্রামস্থলে আপনি সুখে নিদ্রালাভ করুন। আপনাকে নমস্কার। হে জগন্নাথ! আপনি শয়ন করলে এই জগৎ সুপ্ত হয় এবং আপনার জাগরণে সমগ্র জগৎ জাগরিত হয়। হে অচ্যুত! আমার প্রতি প্রসন্ন হোন। চাতুর্মাস্য ব্রত উদযাপনকারী ব্যক্তি এইভাবে চারমাস যাবৎ প্রার্থনা পূর্বক পরমেশ্বরের কাছে কৃষ্ণভক্তিবৃদ্ধির নিমিত্ত নিয়ম সকল পালন করবে। (হরিভক্তিবিলাস, ১৫.৫৯)
.
সনৎকুমার বলেছেন,
"ভক্তগণ ভক্তি সহকারে শয়ন একাদশী, অথবা আষাঢ় পূর্ণিমা, কিংবা কর্কট সংক্রান্তিতে চাতুর্মাস্য বিহিত ব্রত ধারণ করবে। বছরের চারমাস এই ব্রত উদযাপনের নিয়ম কর্তব্য।"
.
ভবিষ্যপুরাণে চাতুর্মাস্য ব্রতের আবশ্যকতা বর্ণনা করে বলা হয়েছে-
"যে ব্যক্তি নিয়ম অথবা ব্রত, কিংবা জপ ব্যতিরেকে চাতুর্মাস্য ব্রতাচরণ করে, সে মহামূর্খ; তাকে জীবিত অবস্থায় মৃত তুল্য বলে জানবে।"
.
চাতুর্মাস্য ব্রতের বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে শাস্ত্র কথা হল-
"শ্রাবণ মাসে শাক, ভাদ্র মাসে দই, আশ্বিন মাসে দুধ এবং কার্তিক মাসে আমিষ পরিত্যাজ্য 'আমিষ' বলতে ভগবদ্ভক্ত যাঁরা স্বভাবতই আমিষ ত্যাগ করেছেন, তাঁদের পক্ষে মাষকলাই আমিষ বলে নিষিদ্ধ হয়েছে। শাস্ত্রে আরও বলা হয়েছে যে, হরি শয়নে যে ব্যক্তি শিম, বরবটি, কলাই গ্রহণ করে, সে চণ্ডাল অপেক্ষাও অধিক পাতকী; তাকে মহাপ্রলয় পর্যন্ত নারকী হতে হবে। হে মুনিশ্রেষ্ঠ! যে ব্যক্তি হরি শয়নে কলিঙ্গ পটল, বৃন্তিক এবং সন্ধিত - এইসব দ্রব্যাদি গ্রহণ করে তার সপ্ত জন্মের পূর্ণ বিনষ্ট হয় এতে সংশয় নেই। চাতুর্মাস্য ব্রত উদযাপনে মৌসুমি ফলমূল একান্ত বর্জনীয়। "রুচ্যং তত্তৎকাল-লভ্যং ফলমূলাদি বর্জয়েৎ।" কেননা, কালোচিত ফলমূল গ্রহণে জীবের লোভ হয়, তাতে হরি বিস্মৃতি ঘটে আর এই চাতুর্মাস্য কালে ফলমূল প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করলে জড় আসক্তি বৃদ্ধি হয়। সুতরাং, চাতুর্মাস্য ব্রতকালে অবশ্যই তা বর্জন করে ভগবানের দিব্যনাম সংকীর্তনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। এই ব্রতের গ্রহণীয় বিষয়ে হরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে-
"যিনি এই ব্রত পালন করবেন, তিনি জপ, হোমাদির অনুষ্ঠান এবং নাম সংকীর্তন দ্বারা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবেন 'হে দেব! আপনার সন্তুষ্টিকল্পে এই ব্রত গ্রহণ করলাম, হে কেশব! আপনার অনুগ্রহে তা নির্বঘ্নে সিদ্ধি প্রাপ্ত হোক। হে জনার্দন! ব্রত গ্রহণ করে যদি আমার মৃত্যুও হয়, তথাপি আপনার প্রসাদেই তা সম্পন্ন হোক।"
.
ভবিষ্যোতর পুরাণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের কাছে চাতুর্মাস্য ব্রতের মহিমা বর্ণনা করেছেন এইভাবে - "ব্রতকালে বছরের চারমাস স্ত্রী হোন, বা পুরুষ হোন, যিনি আমার ভক্ত, তিনি ধর্মার্থে দৃঢ়ব্রত হয়ে ব্রতের নিয়ম সকল পালন করবেন। নিয়ম ধারণ কর্তার নিয়ম সকলের পৃথক পৃথক ফল বর্ণিত হয়েছে- চাতুর্মাস্য নিয়ম ধারণ পূর্বক যিনি লবণ বর্জন করেন, তাঁর মধুর স্বর এবং তৈলাহার বর্জনে দীর্ঘায়ু ও ধার্মিক পুত্র লাভ হয়, শত্রু নাশ হয়। মধু বর্জন করলে অতুল সৌভাগ্য এবং পুষ্পভোগ বর্জনে বিদ্যাধরতুল্য কান্তি লাভ হয়। এইভাবে যোগাভ্যাস পরায়ণ ব্যক্তি উন্নত লোকের অধিকারী হন। যিনি তিতো, কটু, টক, মধু, ক্ষীর ও কষা জনিত রস সকল বর্জন করেন, তিনি কখনও বৈপরূপ্য ও বৈদগ্ধ প্রাপ্ত হন না। তাম্বুল(পান) ত্যাগ করলে সুখী ও অপক্কভোজী নির্মলতা লাভ করেন। হে রাজন! ভূমি পাথরে শয়ন করলে বিষ্ণুর অনুচর হওয়া যায়। নখ ও কেশ ধারণ করলে দিনে দিনে গঙ্গাস্নানের ফল লাভ হয়।
.
চাতুর্মাস্য ব্রতকালে মৌনী হলে তাঁর কথা অবশ্যই ফলবতী হয় এবং মাটিতে প্রসাদ সেবা করলে পৃথিবীর অধিপতি হওয়া যায়। এসময় বিষ্ণুর পাদপদ্ম বন্দনা করলে গোদান জনিত ফল লাভ হয়। এসময় বিষ্ণুর মন্দির মার্জন করলে স্থায়ী রাজ্যলাভ ঘটে এবং স্তব-স্তোত্র পাঠ করতে করতে তিনবার মন্দির প্রদক্ষিণ করলে বিমানে চেপে বিষ্ণুলোকে গমন করা যায়। বিষ্ণু মন্দিরে খোল করতালাদি সহ ভজন কীর্তন করলে ভগবৎ পার্ষদত্ব লাভ করা যায়। আর যিনি নিত্য শাস্ত্র ব্যাখ্যা দ্বারা লোকসকলকে ভগবৎ আনন্দ দান করেন তিনি ব্যাসরূপী হয়ে ইহলোক ত্যাগের পর বিষ্ণুলোকে গমন করেন। পুষ্পমালা দিয়ে পূজা এবং ভগবানের মন্দির দর্শন করলে বৈকুণ্ঠ লাভ হয়। তীর্থাদি স্নানে নির্মল দেহ এবং পঞ্চগব্য ভোজনে যাবতীয় ব্রতের ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। একাহারী হলে অগ্নিহোত্র যজ্ঞের এবং সমস্ত তীর্থযাত্রার ফল লাভ হয়। আর যে মানুষ নিত্যস্নান ও জপ পরায়ণ হন, তাঁকে আর নরক দর্শন করতে হয় না। ধাতু পাত্রাদি বর্জন করে গাছের পাতা কিংবা শিলায় সেবা করলে পুস্কর কুরুক্ষেত্র প্রয়াগ-স্নানাদির ফল প্রাপ্তি ঘটে। এইভাবে যিনি চাতুর্মাস্য ব্রত কায়মনোবাক্যে যাবতীয় আচরণ করেন তিনি অবশ্যই পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি লাভ করে। ব্রতী শ্রীকৃষ্ণের স্তব-স্তুতি ও পূজা বিবিধ অনুষ্ঠানাদি দ্বারা তাঁকে প্রসন্ন করে বৈষ্ণবগণের সঙ্গে শ্রী চরণামৃত ও মহাপ্রসাদ গ্রহণ করবেন। নৃত্য-কীর্তন দ্বারা ভগবানকে পরিতুষ্ট করে বৈষ্ণবগণের আনুগত্যে তাঁকে নিজ মন্দিরে আনয়ন করবেন।
.
ব্রতী বৈষ্ণবগণের সম্মানার্থে বিদায় দিয়ে ভগবানকে শয়ন করিয়ে বিষ্ণুস্মরণ পূর্বক নিজেও মাটিতে শয়ন করবেন। এইরকম দৃঢ়ব্রত আচরণ করলে চারমাসকাল সুখে অতিবাহিত হবে; এর অন্যথা হলে দুঃখ, অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি দ্বারা অকল্যাণ সাধিত হয়।
.
ভগবান বিষ্ণু যোগনিদ্রা অবলম্বন পূর্বক শেষরূপ সর্পশয্যায় শয়ন করলে ক্ষীর সমুদ্রের সলিল তরঙ্গের দ্বারা ভগবানের চরণদ্বয় ধৌত হয় ও লক্ষ্মীর পদ্ম হাত দ্বারা তাঁর শ্রীপাদপদ্ম পরিমার্জিত হয়। এই সময় যে সমস্ত ভগবদ্ভক্ত বহুনৈষ্ঠিক ব্রতনিয়মাচার দ্বারা চারমাস পালন করেন, তিনি নিত্যকাল বিষ্ণুলোকে অধিষ্ঠিত হন।আসলে, কৃষ্ণসেবা তাৎপর্যই চাতুর্মাস্যের ফল; কেননা এসময় সর্বতোভাবে কৃষ্ণসেবায় তৎপর হতে পারলেই চাতুর্মাস্যের পরম ফল লাভ হয়।
.
জয় শ্রীবিষ্ণু!

Post a Comment

 
Top