0
কাদম্বরী দেবী
কাদম্বরী দেবী
রবীন্দ্রনাথের “রবীন্দ্রনাথ” হয়ে উঠার পিছনে যার প্রেরণা এবং অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হচ্ছেন “কাদম্বরী দেবী” । কাদম্বরী দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের ছিল গভির প্রেম । আর সেই প্রেম কোনভাবেই শরীরের প্রেম ছিল না, ছিল আত্মার গভীরের প্রেম ।
১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল, চারদিকে তখন গ্রীষ্মের প্রচণ্ডতা। ভোরের হাওয়াটুকুও যেন শীতল নয়, দুপুরের কাঠফাটা রোদ্দুরে নাকাল গ্রামবাংলা এমনকি কলকাতার জনজীবন। বসন্ত শেষ হয়েছে, তারপরও প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া;দুষ্টু কোকিল ডেকেই চলেছে কুহু কুহু। এর মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টায় ঘুমের ওষুধ খেলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী- রবীন্দ্রনাথের প্রিয় নতুন বউঠান কাদম্বরীদেবী। তারপর মৃত্যুর সঙ্গে দু’দিন যুদ্ধ করে , ২১ এপ্রিল ভোরের আলো ফোটার আগে সবকিছু ছেড়ে চলেন গেলেন না ফেরার দেশে। জানি না, মৃত্যুর পর এইআত্মঘাতী নারী কোন লোকে স্থান পেয়েছেন? তবে শিল্পরসিক বাঙালির হৃদ- ব্রহ্মকমলে জায়গা করে নিয়েছেন স্থায়ীভাবে। কেন আত্মহত্যা করলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এই আত্মঅভিমানী বধূটি ? কেন আত্মহননের পথ বেছে নিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রাণের সখা, প্রেরণাদাত্রী কাদম্বরীদেবী? মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সকল কবিতার প্রেরণা এবং প্রথম শ্রোতা, অথচ তিনিই রবীন্দ্রনাথের বিয়ের মাত্র চারমাস পর আত্মহত্যা করলেন। রবীন্দ্রনাথ- কাদম্বরীর প্রিয় রবি কী পারতেন না তার প্রিয় নতুন বউঠানকে আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে? কারা তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল? রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীর রোম্যান্টিক সম্পর্ক, যাকে ইন্টেলেকচুয়াল রোম্যান্স বলা যায়, তা-ই কী তাকে জীবনের অন্তিম দিকে ঠেলে দিল? নাকি, ঠাকুরবাড়ির নারীমহল, যারা তাকে কোনোদিন সম্মান তো দেয়নি, মেনে নিতে পারেনি, তাদের প্ররোচনার শিকার হলেন তিনি? সত্যিই তো, তাকে মেনে নেয়া যা-ই বা কেমন করে! অভিজাত ঠাকুর পরিবারে তার বিয়ে হলেও তার জন্ম তো ১৮৫৯ সালের ৫ জুলাই কলকাতার হাড়কাটা গলির এক দরিদ্র পরিবারে। বাবা শ্যাম গাঙ্গুলি ছিলেন ঠাকুরবাড়ির সামান্য বাজার সরকার। মাতা ত্রৈলোক্যসুন্দরীর কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। কোথায় যে হারিয়ে গেলেন চারকন্যার জননী সেই বিদূষী রমনী, তা আজও জানা যায় না। আর তার পিতামহ জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন দারোয়ান যার চিরস্থায়ী আসন পাতা ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রধান গেটে, যদিও তিনি একজন গুণী সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের যে গানের গলা তা পেয়েছিলেন মূলতঃ কাদম্বরীর পিতামহের কাছ থেকে। অথচ বনেদি ঠাকুর পরিবার এই গুণী সঙ্গীতশিল্পীকে কোনোদিন ন্যূনতম সম্মান , এমনকি স্বীকৃতি পর্যন্ত দেননি। মাত্র ন’বছর বয়সে কাদম্বরীর বিয়ে হয় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ষষ্ঠ সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে। প্রবল প্রতাপশালী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্দশ পুত্রকন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্বে অনন্য, শারীরিকভাবে সুঠাম,রূপে-গুণে উজ্জ্বল। শিল্প-সাহিত্য, খেলাধূলা,অশ্বারোহণ ও শিকারে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তিনি বেহালা ও পিয়ানো বাজাতে জানতেন,গান রচনা করে তাতে সুর বসাতে পারতেন। নাট্যকার হিসেবেও ছিলেন দারুণ সফল, বিভিন্ন রঙ্গমঞ্চে তার নাটক মঞ্চায়ণ হত নিয়মিত। তখন বাংলার সারস্বত সমাজের সকলেরই দৃষ্টি ছিল ঠাকুরবাড়ির এই প্রতিভাধর তরুণটির প্রতি, অনেকেরই ধারণা, তিনি ভবিষ্যতে বড় কিছূ হবেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পরে অনেক ভাইবোন জন্ম গ্রহণ করলেও, তিনি প্রায় সবার কাছে ছিলেন নতুনবাবু বা নতুনদা হয়ে। আর সে হিসেবে কাদম্বরী ছিলেন নতুন বউঠান হয়ে। দেবেন্দ্রনাথের অন্যান্য পুত্রবধূরা এসে গেছেন, কিন্তু কাদম্বরী নতুন বউঠান রয়ে গেলেন, পুরোনো আর হলেন না। ১৮৬৮ সালের ৫ জুলাই, কাদম্বরীর জন্মদিনে ঊনিশ বছর বয়সী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে তার বিয়ে হল স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথের অনিবার্য আদেশে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অনেকেই বিশেষ করে, দেবেন্দ্রনাথের মেজছেলে আইসিএস অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী এই বিয়ে মেনে নেননি কোনোভাবেই। মেজবউ জ্ঞানদা বলতেন, বাবামহাশয়ের অন্যায় জেদের কারণে এ বিয়েটা হল। জ্যোতি মেনে নিল বটে, কোন প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না কিন্তু এ বিয়েতে কারো মঙ্গল হবে না। সত্যিই তাই, এ বিয়ে সুখের হয়নি, জ্যোতি কাদম্বরীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে মনে হয় না একদিনের জন্যও সুখী হতে পেরেছিলেন। দু’ জনের মধ্যে ছিল যোজন যোজন দূরত্ব। এ দূরত্ব যেমন শিক্ষাদীক্ষা,বংশমর্যাদায় ছিল, তেমনি ছিল বয়সে। জ্ঞানদাদেবী তো প্রায়ই বলতেন,‘ নতুনের জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। কী যে একটা বিয়ে হল ওর। কোথায় নতুন আর কোথায় ওর বউ! এ বিয়েতে মনের মিল হওয়া সম্ভব নয়। স্ত্রী যদি শিক্ষাদীক্ষায় এতটাই নীচু হয়, সেই স্ত্রী নিয়ে ঘর করা যায় হয়তো, সুখী হওয়া যায় না। নতুন তো সারাক্ষণ আমার কাছেই পড়ে থাকে। গান বাজনা থিয়েটার নিয়ে আছে, তাই সংসারের দুঃখটা ভুলে আছে।’ মেজবউ জ্ঞানদাদেবী, জ্যোতিবাবুর বিয়ে ঠিক করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু ডা. সূর্যকুমার চক্রবর্তীর বিলেতফেরত মেয়ের সঙ্গে। কাদম্বরীর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ের পরপরই সবাই বলতে লাগলো, নতুনের ভাগ্যটাই খারাপ। কোথায় সূর্যকুমারের বিলেতফেরত মেয়ে, আর কোথায় বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ে! কেবল জ্ঞানদাদেবী নয়; ঠাকুরবাড়ির নারীমহলের প্রায় সবাই মনে করতো, ঠাকুরবাড়ির রূপকুমার, রূপেগুণে অনন্য, সরস্বতীর বরপুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই কাদম্বরীর নেই। তারপরও কেন যে জ্যোতিন্দ্রনাথের মতন দেবোপম পুরুষের সঙ্গে সামান্যা কাদম্বরীর বিয়ে হল? বিয়ে হয়েছিল কেবলমাত্র কন্যা অর্থাৎ কাদম্বরীর সহজলভ্যতার যোগ্যতায়, আর শুধুমাত্র কনে খোঁজার ভয়ে। এ কথা কাদম্বরীও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। হাতের কাছেই কাদম্বরীরা থাকতেন; ঠাকুরবাড়ির গরিবমহলে, নীচের তলায়। তাছাড়া অভিজাত, কুলীন হিন্দুরা ঠাকুরবাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইতো না। কারণ জোড়াসাঁকোর ঠাকুররা দেব-দেবতায় বিশ্বাসী হিন্দু ছিলেন না; ছিলেন পৌত্তলিকতা বিরোধী, একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম। যে শালগ্রাম শিলা সাক্ষী রেখে হিন্দু বিয়ে সম্পন্ন হয়, সেই শালগ্রাম শিলাই ব্রাহ্মরা মানে না! তার ওপর মুসলমানের হাতে জল খাওয়া পিরালি ব্রাহ্মণ! হিন্দু ব্রাহ্মণরা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের ব্রাহ্মণই মনে করতো না। সুতরাং অভিজাত হিন্দুরা ঠাকুর পরিবারে মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না। সেই কারণে সম্ভবত জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরীদেবী, ভবতারিনীর মতো অতি সাধারণ পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের রূপেগুণে অসাধারণ সব ছেলের বিয়ে হয়েছিল। তবে কাদম্বরীর পিতৃপরিচয় যা-ই হোক, তিনি যে যেনতেন মেয়ে ছিলেন না তা প্রমাণ করেছেন তার বহুমাত্রিক যোগ্যতা দিয়ে। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ, জ্ঞানদা দেবী এবং ঠাকুরবাড়ির নারীমহলের কেউ কেউ তা মানতে চাননি। জ্ঞানদাদেবীর মত তিনিও নিজেকে সামান্য থেকে অসামান্যে রূপান্তর করেছেন, যা রীতিমত বিস্ময়কর। কেবল রূপে-গুণে-রুচিতে নয়; লেখাপড়া,গানবাজনা,অভিনয়েও কাদম্বরী ছিলেন অতুলনীয়। তারপরও এই রুচিশীল নারীকে নানাভাবে লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে হয়েছে। ঠাকুরবাড়ির পরিশীলিত সাংস্কৃতিক আবহ ও বিনয় বচনের মধ্যেও তাকে সইতে হয়েছে নিন্দা বিদ্বেষ কুৎসার তীব্র আঘাত। এত লাঞ্ছণা, এত আঘাত, এত জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন, কারণ রবীন্দ্রনাথকে যিনি সখা হিসেবে পেয়েছেন, তিনি কি আর মরতে চান! রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার প্রাণের সখা, প্রাণের রবি। ঠাকুরবাড়িতে সব দুঃখ, সব বেদনা, সব অপমানের মাঝে কেবল রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার পরম ধন, একমাত্র পাওয়া। ন’ বছর বয়সে যেদিন তিনি ঠাকুরবাড়ির বউ হয়ে এলেন, সেদিন থেকে রবিই হয়ে ওঠেন তার খেলার সাথি, প্রাণের দোসর। কৈশোরে রবি ছিলেন তার একমাত্র বন্ধু। রবির হাতে হাত রেখেই তো ভাললাগার প্রথম আলো দেখা। নতুন বউঠানের মনে হয়েছিল,তার প্রতি ঠাকুরবাড়ির সব লাঞ্ছণা, অবহেলা, অপমান, উপেক্ষা,ঘৃণা-কুৎসার যেন প্রতিশোধ নিলেন রবি। সারা ঠাকুরবাড়িতে কাদম্বরী একজনকেই প্রাণের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন যে তার কষ্ট, দহন বুঝেছিল গভীরভাবে। সত্যিই তাই, নতুন বউঠানের ভেতরের দহন যদি কেউ বুঝে থাকে তা কেবল রবীন্দ্রনাথই বুঝেছিলেন। তাইতো নতুন বউঠানের মন ভালো না থাকলে রবি বলতেন, ‘ নতুন বউঠান, কী হবে ছোটখাটো দুঃখের কথা মনে রেখে? ভুলে যাও, সব ভুলে যাও।’ ঠাকুরবাড়ির নারীমহল তাকে সারাজীবন হেয় প্রতিপন্ন করেছে, কষ্ট দিয়েছে; স্বামীর সোহাগ বলতে যা বোঝায় তাও কখন পাননি। ষোল বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তানের মা হতে পারেননি। এত দুঃখ, এত হতাশার মাঝে রবিই ছিল তার সান্ত¦নার ¯িœগ্ধ প্রলেপ, একমাত্র আশ্রয়। রবি যখন বলতেন, ‘ নতুন বউঠান, ভুবন জুড়ে এত আনন্দ, সেই আনন্দধারাকে অন্তরে গ্রহণ করো, দেখবে ঝরাপাতার মতো পুরনো দুঃখ সেই আনন্দ¯্রােতে ভেসে গেছে’-তখন তার কী - যে আনন্দ লাগতো তা ভাষাই প্রকাশ করা যাবেনা। আকাশের রংও বিভা কীভাবে দেখতে হয়, মর্ত্যরে রূপ অরূপের লীলা কীভাবে উপভোগ করতে হয় তার শিক্ষাও তো নতুন বউঠানের কাছ থেকে পেয়েছেন রবি। নতুন বউঠানের চোখের দিকে তাকিয়ে রবি একদিন রচনা করলেন এক কালজয়ী গান: ‘এ কী সুন্দর শোভা/ কী মুখ হেরি এ ’। সেদিন ছিল জ্যোৎ¯œারাত । আকাশে উঠেছে রূপোর থালার মতন চাঁদ। গঙ্গার শান্ত জলের বুক চিরে ভেসে চলেছে তাদের নৌকো। আকাশে তখন রংয়ের ছড়াছড়ি, যেন মহাকাল মেতেছে হোলি উৎসবে। তিনজন মানুষ মহাভাবে বিভোর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বাজিয়ে চলেছেন একটার পর একটা রাগ-রাগিনী, রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন আর নতুন বউঠান সেই গানে যোগ দিচ্ছেন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে। নতুনদার বেহাগের সুরের সঙ্গে মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ তখন নিজের রচিত একটি গান গাইলেন: ‘সখি, ভাবনা কাহারে বলে/ সখি যাতনা কাহারে বলে/ তোমরা যে বল দিবস-রজনী,/ভালবাসা, ভালবাসা ’ নতুন বউঠানের কাছেই তো রবি শিখেছে ভালবাসার গাঢ় গহন গোপন ভুবনে ঢোকার মন্ত্র কখনও বৃষ্টিতে ভিজে, কখনও জ্যোৎ¯œায় ছাদে দাঁড়িয়ে। তাইতো বিলেতে যাবার সময় কেবল একজনের কথা ভেবে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন বেশি, তিনি নতুন বউঠান। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ভারতভূমির দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা যখন তার টনটন করে উঠেছিল তখন একটি গানের খসড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ছায়ানট রাগিনীতে গানে গানে রবি তার প্রিয় নতুন বউঠানকে হৃদয়ের কথা জানিয়ে লেখেন: ‘ তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,/ এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা/ যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো? আকুল নয়নজলে ঢাল গো কিরণধারা/ তব মুখ সদা মনে জাগিতিছে সঙ্গোপনে/ তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল কিনারা।’ একদিন এক গানের জলসায় বিবেকানন্দ যখন গানটি গাইছিলেন তখন রবির বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করছিল। তার মনে হচ্ছিল , এ গান তো কেবল তাদের দুজনের, সর্বসাধারণের জন্য নয়। নতুন বউঠানকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কত গান, কত কবিতা এমনকি উপন্যাস রচনা করেছেন । ‘ বউঠাকুরানির হাট’ উপন্যাসের পরিকল্পনা তিনি দুপুরবেলা বউঠানের পাশে বসে হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে করেছিলেন। কোনোদিন কী কোন মুগ্ধ পাঠক এ কথা জানতে পারবে! বউঠানকে সাজতে দেখে রবি একদিন রচনা করে ফেলেন অনবদ্য সব পঙক্তিমালা: ‘ অশোক বসনা যেন আপনি সে ঢাকা আছে/ আপনার রূপের মাঝার,/ রেখা রেখা হাসিগুলি আশেপাশে চমকিয়ে/ রূপেতেই লুকায় আবার।’ ‘ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতা রবি প্রথম শুনিয়েছিলেন নতুন বউঠানকেই। যেদিন এ কবিতা রচনা করেন সেদিন কবি দৈব দর্শনের মত নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি কোনো কবিতা রচনা করছেন না, কবিতা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার ভেতর থেকে প্রবল বেগে বেরিয়ে আসছে। ভাষার জন্য তাকে চিন্তা করতে হচ্ছে না, চিন্তা যেন ভাষা,ছন্দ,কবিতা হয়ে বেরিয়ে আসছে। কয়েক পঙক্তি লিখে তা একা একা আবৃত্তি করে নিজেই বিস্মিত হয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করছেন, এ কার কবিতা- কে লিখেছে? রবি যখন কবিতাটি গর্জন করে আবৃত্তি করছিলেন, ‘ জাগিয়া উঠেছে প্রাণ/ ওরে উথলি উঠেছে বারি/ ওরে প্রাণের বেদনা প্রাণের আবেগ/ রুধিয়া রাখিতে নারি।’- তখন কাদম্বরী রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কম্পিত কণ্ঠে যখন তিনি বলছেন, তোমার কী হয়েছে, তুমি যা পড়ছো তা কী কবিতা, না অন্য কিছু? সেদিনের তরুণ রবীন্দ্রনাথ তার গুণমুগ্ধ শ্রোতাকে বললেন,‘ নতুন বউঠান, আমার ঘোর লেগেছে, এই প্রভাতের রবির আলোয় আমার প্রাণ জেগে উঠেছে, আমি আমার ভেতরের মহাসমুদ্রের গর্জন শুনতে পেয়েছি। কিসের ঘোরে আমি আচ্ছন্ন তা জানি না, তবে আমি যেন আমার মধ্যে নেই।’ ১৮৭৮ থেকে ১৮৮০ সাল কাদম্বরীর জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দাহনকাল, এই দুটি বছরের প্রতিটি প্রহর কেটেছে বিরহ- বেদনায়। এ দু’বছর রবীন্দ্রনাথ বিলেতে ছিলেন। বিলেত থেকে যখন ফিরলেন তখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িকে ঘিরে সূচিত হল গান-বাজনা,নাটক-থিয়েটার,সৃজন-মননচর্চার এক নতুন অধ্যায়, নতুন কালপর্ব। ১৮৮২ সালের মধ্যে ঠাকুরবাড়িতে ঘটলো বঙ্গ সংস্কৃতির নবজাগরণ। বাংলার সারস্বত সমাজের দৃষ্টি তখন রবীন্দ্রনাথের দিকে। তিনি তখন গানে প্রাণে, সুরে ছন্দে,নাটকে গল্পে সারা বাংলাকে মাতিয়ে তুলেছেন। তিনি হয়ে উঠলেন বঙ্গ সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ, আর তার প্রাণদুহিতা, প্রেরণাদাত্রী হলেন কাদম্বরীদেবী। এর মধ্যে ‘ ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন: ‘ সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের / গাছগুলি মনে পড়ে সেই অশ্রুজলে সিক্ত/ আমার প্রাণের ভাবনাগুলিকে মনে পড়ে।/ আরএকজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল,/ তাহাকে মনে পড়ে।’ লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর বাবা দেবেন্দ্রনাথ তাকে মুসৌরিতে তলব করলেন এবং বিয়ে করার আদেশ দিলেন। বাবার অমোঘ আদেশে ১৮৮৩’র ৯ ডিসেম্বর খুলনার দক্ষিণডিহির বেণী রায়ের ন’বছরের কন্যা ভবতারিনীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হল। ঠাকুরবাড়িতে ভবতারিনীর নাম দেয়া হল মৃণালিনী। বিয়ের পর মৃণালিনীকে নিয়ে রবি মেজবউঠানের কাছেই থাকতে লাগলেন। জোড়াসাঁকোর বাড়ির যে ঘরটিতে রবি থাকতেন সেটি পবিষ্কার করতে গিয়ে কাদম্বরী একদিন আবিস্কার করলেন একটি অসমাপ্ত কবিতার দুটি পঙক্তি। পঙক্তি দুটি পড়ে ভেতরে তার রক্ত ক্ষরণ শুরু হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ--তার প্রিয় রবি লিখেছে: ‘ হেথা হতে যাও পুরাতন!/ হেথায় নতুনের খেলা আরম্ভ হয়েছে..’ তিনি প্রচ-ভাবে কষ্ট পেলেন; তারপরও তার মনে হল, এটাই জগতের নির্মম সত্য। নতুনের জন্য পুরাতনকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, আর এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। সে পুরাতন হয়ে গেছে, তাই তাকেও স্থান ছেড়ে দিতে হবে। তারপর খুব বেশিদিন আর ঠাকুরবাড়িতে থাকলেন না তিনি। একদিন ঘুমের ওষুধ খেয়ে, কেউ বলে আফিম খেয়ে গহন গভীর ঘুমের দেশে চলে গেলেন, আর ফিরে আসলেন না। যে-নারী স্বামীর সাহচর্য পাই না, সন্তানের মা হতে পারে না- সে কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? অন্য একজনকে নিয়ে সে সুখী হতে চেয়েছিল, সেও যখন জীবন সাথি জোগাড় করে নিয়েছে তখন বেঁচে থাকার কোন অর্থই থাকেনা! তারপর নিরর্থক জীবনের মোহ ছেড়ে, নতুনের জন্য স্থান করে আঁধারে মিলে গেলেন ঠাকুরবাড়ির চিরঅভিমানী বধূটি। তার মৃত্যুসংবাদ কলকাতার কোনও দৈনিক কিংবা সাময়িকপত্রে ছাপা হয়নি। ঋষিতুল্য পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদেশে কাদম্বরীর আত্মহত্যা সংক্রান্ত প্রমাণাদি কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, পাছে তার অস্বাভাবিক মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ হয়ে যায়। পুরোহিত হেমচন্দ্র বিদ্যারতœকে আনা হয়েছির শ্মশানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করতে। প্রচুর চন্দন কাঠ,গব্য ঘৃত,ধূপ ধুনো সংগ্রহ করা হয় দাহ’র জন্য। শাস্ত্র মতে, পুত্রহীনার মুখাগ্নি করার কথা স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। কিন্তু অত্যন্ত ভেঙে পড়ায় স্ত্রীর শেষ কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি। স্ত্রীর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুতে তিনি এতই বিচলিত ও শোকার্ত হয়েছিলেন যে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেননি, শোকে স্তব্ধ হয়ে বিছানায় মুখ গুজে শুয়ে ছিলেন, স্ত্রীর শেষ মুখখানিও তার দেখা হয়নি। অবশেষে বড়দাদার ছেলে দিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজটি সম্পন্ন করেন। নিমতলার শ্মশানে চিতার আগুনে যখন কাদম্বরীর নিথর দেহটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল তখন রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিপটে কত ছবিই না ভেসে উঠছিল! চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগানবাড়ি, গঙ্গার বুকে নৌকা ভাসিয়ে আকাশের রং-বিভা দেখা, ঠাকুরবাড়ির নন্দন কানন,‘ অলীক বাবু’ নাটকে নায়ক নায়িকার অভিনয়, সদর স্ট্রিটের বাড়ির ছাদে বসে জ্যোৎ¯œালোকে অবগাহন করে কেঁপে ওঠা, চিলেকোঠার আড়ালে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা, নতুন গানে সুর বসিয়ে নতুন বউঠানকে শোনানো, নন্দন কাননের চাঁপা গাছ থেকে স্বর্ণচাঁপা তুলে বউঠানের খোঁপায় গুঁজে দেয়া, খোঁপায় যুঁইয়ের মালা জড়িয়ে নীল রংয়ের শাড়ি পরে আয়নার সামনে নতুন বউঠানের দাঁড়িয়ে থাকা, নতুন নতুন কবিতা নিয়ে আলোচনা, আরও কত ছবি,কত কথা! কাদম্বরীর যখন মৃত্যু হল , তখন রবীন্দ্রনাথের নতুন গ্রন্থ ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ এর কাজ চলছিল। তার মনে হচ্ছিল নতুন বউঠান থাকলে নাটকের মধ্যের ‘ মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’ গানটির সুর নিয়ে কিংবা দু’ একটা শব্দ পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা যেতে পারতো। কাদম্বরীর আত্মহত্যার পর রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল সমগ্র জগৎ যেন আত্মহত্যা করেছে। তারপরও শোক-দুঃখ, বিরহ-মৃত্যু কোনো কিছুই তাকে জীবন জগতের আনন্দযজ্ঞ থেকে দূরে রাখতে পারেনি, মর্ত্য-মানবের প্রেমে ব্যাকুল এই কবিপুরুষ এই বিশ্বনিখিলকেই সত্য বলে জেনেছেন আর তাই গান- ধ্যান, সৃজন আনন্দের পথ থেকে কখনও বেপথু হননি। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বলেছেন:‘ মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে বাঁচিবারে চাই।/ এই সূর্য করে, এই পুষ্পিত কাননে/ জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পায়।’ মৃত্যুর পর এত বছর কেটে গেছে, তারপরও বাঙালির স্মৃতিসত্তা থেকে মুছে যাননি নতুন বউঠান কাদম্বরীদেবী বরং ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’, মল্লিক সেনগুপ্তের ‘কবির বৌঠান’, প্রভাত মুখোপাধ্যায়েয়র ‘রবীন্দ্র জীবনী’, প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’ সুব্রত রুদ্রের ‘কাদম্বরীদেবী’ তারই প্রমাণ বহন করে। অবশ্য রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের ‘কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট’ এ রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরীর সম্পর্ক নিয়ে যথেচ্ছ খেলাধুলো করা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, তাদের দুজনকে নিয়ে যেমন গুজব- গুঞ্জন রয়েছে, ফিসফিসানিও কম নেই। দিন যতই যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেমন আমাদের আগ্রহ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরীর সম্পর্ক নিয়ে। তাদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে ইতোমধ্যে বাঙালিদের মধ্যে একটা মিথ তৈরি হয়ে গেছে। প্রায় সকলেই ভাবে, রবীন্দ্রনাথের মতো দেবতুল্য মানুষও প্রেম করতো! তাও কী-না আবার বৌদির সঙ্গে! এবং কবির বিয়ের মাত্র চারমাসের মধ্যে কাদম্বরী আত্মহত্যা করেছিলেন। এই প্রশ্নটা আজও সবার মধ্যে ঘুরপাক খাই, কেন তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন? এর জন্য দায়ী রবি, না জ্যোতিরিন্দ্রনাথ? নাকি, মেজবউঠান জ্ঞানদানন্দিনী? আসলে তাদের দুজনের সম্পর্কের মধ্যে একটা ড্রামা আছে। এ কারণে চারদিকে তাদের নিয়ে নাটক, উপন্যাস,গল্প লেখা হচ্ছে; নির্মাণ করা করা হচ্ছে চলচ্চিত্র। তবে অনেক কিছুই শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। তারপরও বলবো, আমাদের শিল্প- সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নাম যতদিন থাকবে, তাঁর প্রথম যৌবনের প্রেরণাদাত্রী হিসেবে কাদম্বরীর নামটাও বাঙালি ভুলে যাবে না।

Post a Comment

 
Top